বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন
ভয়েস প্রতিবেদক, উখিয়া:
হামলা, হত্যায় ৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। তারপর ও এখনো থামেনি রোহিঙ্গা দু’গ্রুপের সংঘর্ষ। যার কারণে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ সাধারণ রোহিঙ্গাদের।
আরসা ও মুন্না গ্রুপের দফায় দফায় হামলার ঘটনায় গত ৫ দিনে ৪ খুন, অর্ধশতাধিক আহত, শতাধিক ঝুঁপড়ি ঘর ভাংচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় উখিয়া থানায় ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতরা হলেন, ইমাম শরীফ, শামসুল আলম, মো: ইয়াছিন ও সমিরা আকতার।
গত রাতে পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালিয়ে ১০ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আটক করতে সক্ষম হয়। এ সময় ৪টি দেশীয় তৈরী অস্ত্র, বিশ রাউন্ড কার্তুজ, ধারালো কিরিচ, লোহার রড ও গুলি উদ্ধার করা হয়। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে অতিরিক্ত আর্মড ব্যটালিয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গরা বলছেন, আরসা ও মুন্না গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে এক ধরণের ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে আরসার ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে কয়েক হাজার নারী, পুরুষ, শিশু কুতুপালং টু ইস্ট ক্যাম্পে অবস্থিত মরকজে (বড় মসজিদ) অবস্থিত নিয়েছে বলে জানিয়েছে রোহিঙ্গা নেতা আহম্মদ। সে আরো বলেন, দিনের বেলায় আইনশৃংখলা বাহিনীর টহল জোরদার থাকার কারণে আরসা গ্রুপের তৎপরতা কম দেখা গেলেও রাতের বেলায় তাদের স্বশস্ত্র মহড়া চলে।
কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হাফেজ জালাল আহমদ বলেন, ইয়াবা, অস্ত্র, স্বর্ণ চোরাচালান, ত্রাণের মালামাল ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরসা ও মুন্না গ্রুপের একের পর এক খুন, অপহরণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। তিনি আরো বলেন, এসব ঘটনার কারণে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে আতংক বিরাজ করেছে। চলমান ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে ইতিমধ্যে সহস্রাধিক রোহিঙ্গা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পে দায়িত্বরত আর্মড ব্যাটালিয়ানের পরিদর্শক সালাউদ্দিন পাটান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংগঠিত ঘটনায় ৪টি মামলা রুজু করা হয়। এ ঘটনায় এজাহার নামীয় এক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী আটক করা হয়। আটককৃত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে থানায় সোর্পদ্দ করা হয়।
অপর দিকে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)- ১৫ মঙ্গলবার সকালে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চাকমারকুলের পাহাড়ি এলাকা থেকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে লিপ্ত ৯ জন রোহিঙ্গাকে অস্ত্রসহ আটক করেছে। এসময় তাদের কাছ থেকে চারটি দেশে তৈরি অস্ত্র, ২০ রাউন্ড কার্তুজ, ধারালো কিরিচ, লোহার রড ও গুলতি উদ্ধার করা হয়েছে। আটককৃতরা হলেন রশিদ আহমদ (৩২), ছলিমুল্লাহ (৫৫), শফিক আলম (২০), আব্দুল হামিদ (২০), মো: সাবের (৩২), মো: ছালাম (৫০), ইসমাইল (২৫) হারুনুর রশিদ (২৮) ও ফয়েজ (২২) । আটকরা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। তারা সম্প্রতি কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে ‘গোলাগুলি’র ঘটনায় জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে র্যাব।
কুতুপালংয়ের নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ ও আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। গত ৪ দিনে খুন হয়েছে ৩ জন। সর্বশেষ সোমবার কুতুপালং ক্যাম্পে মোহাম্মদ ইয়াছিন (২৪) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক খুন হয়। এর আগে গত ৪ অক্টোবর ভোররাতে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে দুই জন রোহিঙ্গা নিহত হয়। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বরও একইভাবে সংঘর্ষে ১৫ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা আহত হয়েছে।
এ ব্যাপারে উখিয়া থানা অফিসার ইনচার্জ আহমেদ সঞ্জুর মোরশেদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪টি মামলা রুজু করা হয়েছে।
এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতার মুখে কতিপয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী কুতুপালং এলাকা থেকে ছেড়ে চাকমারকুলের পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছিল বলে জানিয়েছে র্যাব।
জানাতে চাইলে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ খলিলুর রহমান খান বলেন, ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। রাতের বেলায় কিছুটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আশকরি দ্রুত সময়ের ক্যাম্পের সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
র্যাব-১৫ এর কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানী কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান জানান, কিছু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির এলাকায় গোলাগুলি করেছিল। দুয়েকদিন আগে র্যাব তাদের ধাওয়া দেয়। এক পর্যায়ে তারা কুতুপালং ছেড়ে হোয়াইক্যংয়ের চাকমারকুল এলাকার পাহাড়ে অবস্থান নেয়। গোপন সূত্রে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে অভিযান চালায় র্যাব। এসময় আমরা ৯ জনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি। তাদের কাছ থেকে দেশে তৈরি চারটি অস্ত্র, ২০ রাউন্ড কার্তুজ, কিরিচ উদ্ধার করা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক। যে কোন ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃংখা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের দু’গ্রুপের মধ্যে চলমান বিরোধ এখনো পুরোপরি কেটে যায়নি বলে ধারণা করছেন তিনি।
এদিকে গত কয়েক দিনের গোলাগুলি ও খুনের ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে কয়েক’শ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু কুতুপালং ক্যাম্প ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছে বলে রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছে।
ভয়েস/জেইউ।